
ছবি : ছবির সকল অধিকার সংরক্ষণ করে Affixin Media Online
আমরা এখন গেমিং ডিজিটাল পরস্পর-নির্ভরশীলতার পর্যায়ে। এখানে অংশীজন ও সব পক্ষ স্বীকার করেছে যে, ইন্টারনেটের স্থিতিশীলতা, নির্ভরযোগ্যতা, টেকসই মজবুত অবস্থা দরকার। সিকিউরিটি, স্ট্যাবিলিটি, রোবাস্টনেস, রেজিলেন্স অ্যান্ড ফাংশনস। অপরদিকে এটাও সবাই স্বীকার করেন আইসিটি ও ইন্টারনেটকে অপব্যবহার করে বৈশ্বিক পর্যায়ে অনিরাপত্তা বৃদ্ধি করা, মানবাধিকার লঙ্ঘন করা এবং সরকার-প্রশাসন ও শক্তিশালী অর্থনৈতিক শক্তিগুলো জনগণের ক্ষমতায়ন ও স্বার্থ বিঘ্নিত করছে।
তাই এ রকম পরিস্থিতিতে সামনে এগোতে হলে ডিজিটাল সুরক্ষা পরিকল্পনা দরকার। দরকার ডিজিটাল পরস্পর-পরস্পর নির্ভরশীলতা। যা বৈশ্বিক-আঞ্চলিক-জাতীয় পর্যায়ভিত্তিক হতে হবে। এর জন্য ডিজিটাল
টেকসই করা পরিকল্পনা ও ডিজিটাল মানবাধিকার পরিকল্পনা ইমার্জিং টেকনোলজি আনার পরিকল্পনা ।অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল সমাজ ও অর্থনীতি সবার জন্য গড়তে হলে তাই ইন্টারনেট পরিচালনায় দক্ষ হতে হবে এবং সাইবার নিরাপত্তা বিধানে, মানবাধিকার নিশ্চিতে ফেয়ার ডিজিটাল বাজারে উদ্যোক্তাদের অধিকার নিশ্চিতের কার্যকরী হাতিয়ার হতে পারে। নীতিগত বিষয় সামনে নিয়ে এ মুহূর্তে দেশের বিকাশমান ডিজিটাল সমাজকে আরও বেগবান ও কার্যকর করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।
ইন্টারনেট অধিকার মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি; মৌলিক অধিকার হিসেবে বাস্তবায়ন সময়ের দাবি। সাশ্রয়ী মূল্যে দ্রুতগতিসম্পন্ন ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত জরুরি ভিত্তিতে করা। ডিজিটাল বৈষম্য কমাতে সাশ্রয়ী মূল্যে স্মার্ট ফোন তথা এন্ড্রয়েড ফোন নিশ্চিত করতে অ্যান্ড্রয়েড ফোনের ওপর সব ট্যাক্স প্রত্যাহার করা জরুরি।
ফ্রিজ, টিভিসহ যন্ত্রপাতি সহজ ভিত্তিতে কেনাবেচা হয়, তাই এন্ড্রয়েড ফোনও কিস্তিতে কেনাবেচার পদ্ধতি চালু করা। স্থানীয় সরকার সে লক্ষ্যে কিছু অর্থ বরাদ্দ রাখবে। ব্রডব্যান্ড সংযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে স্থানীয় সরকারের এ বিষয়ে তদারকি করা দরকার। তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তির নতুন উদ্ভাবিত প্রযুক্তিগুলোর ব্যবহার-লেখা আয়ত্ত করার জন্য উপজেলা-জেলায় কার্যকর প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা জরুরি ভিত্তিতে গড়া, এসব প্রশিক্ষণ দায়সারা গোছের না করে যথেষ্ট সময় নিয়ে চালানো দরকার। তথ্য সুরক্ষা বা ডাটা প্রটেকশন অ্যাক্ট এবং ই-কমার্স জরুরি ভিত্তিতে করা।
ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের জগতে আজকাল ‘স্টার্টআপ’শব্দটি প্রায়ই শোনা যায়। বাজারে থাকা চাহিদার একটি উদ্ভাবনী সমাধান দেয় এমন নতুন উদ্যোগকে স্টার্টআপ বলা হয়। কোভিডকাল পেরিয়ে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে দেশ। তরুণরা যুক্ত হচ্ছেন নতুন নতুন উদ্যোগে। এর অধিকাংশই অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন উদ্যোগ। দেশে দ্রুতগতির ফোর-জি ও ফাইভ-জি ইন্টারনেট সুবিধা স্টার্টআপগুলোকে নতুন স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছে। কোভিডকাল তাদের নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। প্রচলিত চাকরির পরিবর্তে নিজের উদ্যোগে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য চেষ্টা শুরু করেছেন অনেক তরুণ উদ্যোক্তা।
দেশে স্টার্টআপ সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সরকারি ও বেসরকারি নানা উদ্যোগ চালু রয়েছে। সরকারি পর্যায়ে দেড় শতাধিক স্টার্টআপকে তহবিল দেওয়া হয়েছে। সরকারের স্টুডেন্ট টু স্টার্টআপ কর্মসূচিসহ আইডিয়া প্রকল্পের আওতায় গত ছয় মাসে প্রায় সাত হাজার স্টার্টআপ দাঁড়িয়েছে। এ খাত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, করোনাকালে নতুন এসব স্টার্টআপ নতুন পথ দেখাচ্ছে। ফেসবুকভিত্তিক নানা ই-কমার্স ও সেবাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো করছে। বিশেষ করে লাইফস্টাইলভিত্তিক ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো গত কয়েক মাসে জনপ্রিয় হয়েছে বেশি।
অনলাইনে বিক্রি হচ্ছে খাবার, নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীসহ নানা জিনিস। চালু হয়েছে বিভিন্ন অনলাইন প্রশিক্ষণ। সেখানে বর্তমানে কাজে লাগছে জুম, গুগল মিট, মাইক্রোসফট টিমস, স্কাইপে, হ্যাংআউটস ইত্যাদি সফটওয়্যার। ডিজিটাল মার্কেটিং, ভাষা শিক্ষার মতো বিষয়েও প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে অনলাইনে।
ইন্টারনেটের কল্যাণে এখন এক দশক এগিয়েছি আমরা অনলাইন ব্যবসায়। মানুষ এখন ঘরের জিনিস, খাবার ও কাপড়চোপড় কিনছেন। এখন যারা নতুন শুরু করে অনলাইন ব্যবসা করতে চান, তাদের উচিত ব্যবসায় জোর দেওয়া। এখনই সঠিক সময়।
গত কয়েক মাসে স্টার্টআপ হিসেবে ভালো করেছে ক্লাউড ও এআইভিত্তিক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ইন্টারঅ্যাকটিভ কেয়ারস। এ ওয়েবসাইট থেকে সার্বক্ষণিক ই-লার্নিং, চিকিৎসা, মানসিক স্বাস্থ্য এবং আইনি সেবা পেতে পারেন ব্যবহারকারীরা। করোনাকালে ইন্টারঅ্যাকটিভ কেয়ারসের ই-লার্নিং, টেলিমেডিসিন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিয়েছে অনেক মানুষ। এর বাইরে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ছাত্রছাত্রীদের সম্পৃক্ততা বেড়েছে অনলাইনে। ইন্টারনেট সুবিধার কারণে সহজে এ ধরনের প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হতে পেরেছে মানুষ। দেশে অসংখ্য উদ্যোক্তা রয়েছেন, যারা শুধু ফেসবুক পেজের মাধ্যমে তাদের ব্যবসা পরিচালনা করছেন। করোনাকালে টেলিমেডিসিন সেবা নিয়ে হাজির হয়েছিল মাইসফটের মাইহেলথ বিডি। ইন্টারনেট সেবার কারণে টেলিমেডিসিন সেবার ব্যাপক ব্যবহার বেড়েছে। চিকিৎসকদের সঙ্গে সরাসরি দেখার পরিবর্তে অনেকেই টেলিমেডিসিন সেবা নিচ্ছেন।
একজন উদ্যোক্তা সফল হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে লাখো তরুণের স্বপ্ন পূরণ হবে। সরকার চায় তরুণরা শুধু চাকরির পেছনে না ছুটে সফল উদ্যোক্তা হবে। তারা হোমগ্রোন সলিউশনের মাধ্যমে প্রযুক্তিনির্ভর, জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা তথা ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখবে। আগামীর বাংলাদেশে এই স্টার্টআপই হতে পারে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার অনেক বড় ক্ষেত্র।
আগামীর বাংলাদেশে এই স্টার্টআপকেই অর্থনৈতিক সম্ভাবনার অনেক বড় ক্ষেত্র মনে করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে কিছু সাফল্যের উদাহরণ তৈরি হয়েছে। গত বছর বাংলাদেশে স্টার্টআপে বিনিয়োগ হয়েছে আগের বছরের প্রায় ১০ গুণ। দেশে এখন এ ধরনের উদ্যোগের সংখ্যা ১২ শতাধিক। এসব প্রতিষ্ঠান প্রায় ১৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান করছে। আর স্টার্টআপের উদ্যোক্তা বেশিরভাগই তরুণ, যাদের ওপর নির্ভর করছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।
বাংলাদেশি স্টার্টআপদের মধ্যে চালডাল ডটকম, পাঠাও, শপআপ, সেবা, টেন মিনিট স্কুল, পেপারফ্লাই, ট্রাক লাগবে, শিউর ক্যাশ, সহজ, প্রাভা হেলথ, আই ফার্মার, শিখো ইত্যাদি পরিচিত। এমনকি মোবাইল ফোনের মাধ্যমে আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বিকাশের যাত্রা হয়েছিল স্টার্টআপ হিসেবেই। স্টার্টআপের হাত ধরেই বাংলাদেশের অর্থনীতির সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে অন্য উচ্চতায় পৌঁছানোর। বিভিন্ন ধরনের স্টার্টআপের মধ্য বেশি বিনিয়োগ পাচ্ছে আর্থিক প্রযুক্তি বা ফিনটেক। এর মধ্যে বিকাশ ২৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ এনেছে। এ ছাড়া লজিস্টিকস, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, ই-কমার্স প্রভৃতি খাতে বিনিয়োগ আসছে।
সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাত স্টার্টআপে উৎসাহ জোগাচ্ছে। সরকারের আইসিটি বিভাগের ৫০০ কোটি টাকার একটি ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ড রয়েছে। প্রতিবছর এখান থেকে তহবিল পাচ্ছেন উদ্যোক্তারা।
বেসরকারি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে গ্রামীণফোন, বাংলালিংক, ব্র্যাকের মতো প্রতিষ্ঠান স্টার্টআপের জন্য সহায়তা কর্মসূচি নিয়েছে। দেশের সেরা স্টার্টআপগুলোকে খুঁজে বের করে বিনিয়োগ পেতে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও সহায়তা করা হয়। গ্রামীণফোন এক্সেলারেটরের ৭টি ব্যাচ ৫০টি স্টার্টআপ গ্র্যাজুয়েশন করেছে। এসব স্টার্টআপ সারা দেশে ৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান করেছে। গ্রামীণফোন এক্সেলারেটর থেকে বের হয়ে স্টার্টআপগুলো এখন অনেক দূর এগিয়েছে।
নতুন উদ্ভাবন, আইডিয়া দিয়ে আমাদের তরুণরাই আগামীর সম্ভাবনা উন্মোচনে নেতৃত্ব দেবে। উদ্ভাবনী ব্যবসায়িক আইডিয়াকে বাস্তবে রূপ দিয়ে আমরা সামনের দিকে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে বাংলাদেশ এখন ২০৪১ সালের মধ্যে স্মার্ট বাংলাদেশের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।
২০৪১ সালে বাংলাদেশে অর্থনীতি হবে প্রযুক্তিভিত্তিক, যেখানে আজকের তরুণরা নেতৃত্ব দেবে। প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা সমাধানে আমাদের তরুণরা ইতিমধ্যে স্টার্টআপ খাতে বিশ্ব জয় করতে শুরু করেছে। বড় বড় অনেক বিদেশি বিনিয়োগ পেতে শুরু করেছে আমাদের স্টার্টআপগুলো। এ যাত্রা অব্যাহত থাকবে এবং স্টার্টআপগুলোর ইনোভেশন আমাদের অনেক সামাজিক সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতে কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে। অনেক তরুণের কাজের প্রথম পছন্দ হবে এসব স্টার্টআপ।
সামনে যে বাংলাদেশ আসছে, তা আজকের বাংলাদেশ থেকে অনেক বেশি আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর হবে। নিজের উদ্ভাবনী শক্তি কাজে লাগিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় এখনই। তরুণদের ভাবনার উন্নয়ন ও বাস্তবে রূপ দিতে সবাই এগিয়ে এলে স্টার্টআপগুলোর উদ্যোগ জিডিপিতে বড় ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৬৫ শতাংশের বয়স ৩৫ বছরের নিচে। তরুণরা প্রযুক্তিপ্রেমী এবং তারা নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নেয়। দেশের মধ্যে প্রতি তিনজনের দুইজন এখন এমএফএস হিসেব রয়েছে। দেশে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের ব্যবহার অনেক বেড়েছে। জনসংখ্যার তরুণ এবং প্রযুক্তিপ্রেমীদের চাহিদা অনুযায়ীই বাজারে পণ্য আসছে। পণ্য ও সেবার চাহিদার পরিবর্তন হচ্ছে। পরিবর্তিত চাহিদা নিয়েই কাজ করছে স্টার্টআপ ব্যবসাগুলো।
বিশ্বে স্টার্টআপের সাফল্যের সবচেয়ে বড় উদাহরণ সিঙ্গাপুর। মানুষের আয় বৃদ্ধি, ব্যবসার অনুকূল পরিবেশ এবং নিরবচ্ছিন্ন দ্রুতগতির ইন্টারনেটের জন্য সিঙ্গাপুর স্টার্টআপের জন্য আকর্ষণীয়। সিঙ্গাপুরের স্টার্টআপ খাতে যে বিনিয়োগ আসে, তা জিডিপির ২৮ শতাংশ।
প্রতিবেশী দেশ ভারতে স্টার্টআপ উৎসাহিত হচ্ছে। তাদের এ খাতে বিনিয়োগ আসে জিডিপির দেড় শতাংশের মতো। বাংলাদেশে জিডিপির অনুপাতে স্টার্টআপে বিনিয়োগ মাত্র শূন্য দশমিক ১০ শতাংশ। তবে আগামীতে এটি বাড়বে, তাতে সন্দেহ নেই। কারণ স্টার্টআপ মানুষের জীবনযাপনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এবং তাদের ব্যবসা বাড়ছে। তাই আমরা প্রত্যাশা করছি, আগামীর বাংলাদেশ হবে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর।